বিদ্যুতে উপদেষ্টা ফাওজুলের চরম স্বেচ্ছাচারিতা
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিদ্যুৎ খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে উঠেছে একের পর এক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ খাতে কোনো অগ্রগতি রেখে যেতে না পারলেও তার নেওয়া স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে এ খাত আরও পিছিয়ে গেছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ উপদেষ্টা ফাওজুল দায়িত্ব গ্রহণের পর এ খাতে জড়িতদের কারও কোনো কথাই শুনতেন না। তার দাম্ভিকতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির। নতুন সরকারের কাছে ইমেজ বৃদ্ধির জন্য ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদীত’ভাবে শেষ সময়ে এসে তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকরা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। বিদ্যুতের পাওনা না মিটিয়ে উল্টো পাহাড়সম দেনা রেখে গিয়ে নতুন সরকারের ওপর বিশাল পাওনা মেটানোর বোঝা চাপিয়ে রেখে গেছেন এই উপদেষ্টা।
ফাওজুল কবির ২০০৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর প্রতিষ্ঠা করেন কিস্টোন কনসালটিং কোম্পানি। পল্লী বিদ্যুতের বিভিন্ন কারিগরি পরামর্শক কাজে সম্পৃক্ত হয় এ প্রতিষ্ঠান। তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স কিস্টোন বিজনেস সাপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে কাজ পায়। এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং সিইও ফাওজুলের স্ত্রী দিলরুবা কবির।
অভিযোগ আছে সে সময় আরইবির বড় বড় প্রকল্প হাতিয়ে নেন দিলরুবা কবির। উপদেষ্টা হিসেবে ফাওজুল শপথ নেন ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট। তার সরকারে নিয়োগ পাওয়ার পর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করার দাবি করে কিস্টোন কোম্পানি। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের কাছে কিস্টোন গত ’২৪ সালের ২৪ অক্টোবরের একটি চিঠিতে চুক্তির অবসান চেয়ে চিঠি দেয়। চিঠির কপি একটি সংবাদমাধ্যমের কাছে এসেছে। কিন্তু তখনো কোম্পানির একজন হিসেবে উপদেষ্টা ফাওজুলের নাম ব্যবহৃত হয়। এ চিঠিটি পাঠানো হয় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ ও ক্ষমতাবর্ধন (ঢাকা-ময়মনসিংহ বিভাগ) প্রকল্প পরিচালককে। সরাসরি এ প্রতিষ্ঠানের অধীন একটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সঙ্গে চুক্তি হয় কিস্টোনের। কিস্টোন গোপালগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রকৌশল পরামর্শক হিসেবে কাজ করে।
যোগাযোগ করা হলে গোপালগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা সম্প্রতি জানায়, আগে তাদের ক্যাম্পাসে কিস্টোনের অফিস ছিল তবে বেশ কিছু দিন আগে তারা অফিস সরিয়ে নেয়। ২৪ অক্টোবর দেওয়া সে চিঠিতে কিস্টোন পল্লী বিদ্যুৎকে বলে, উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান এ চুক্তিতে থাকার কারণে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন আসতে পারে। তবে উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের বেশি সময় পর ২৪ অক্টোবর চিঠি দেয়। তারও এক মাস পর ৩০ নভেম্বর চুক্তির অবসান চাওয়া হয়। শপথের প্রায় সাড়ে তিন মাস পর চুক্তির অবসান চাওয়ার বিষয়ে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। সে সময় কিস্টোন তাদের কয়েকজন প্রকৌশলীকে প্রকল্পে রেখে দেওয়ার আবেদন করে।
গত সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে কাজ পেয়ে যাওয়ার ঘটনায় কিস্টোন ও বিআরইবি কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আর এ সুবিধা পাওয়ার পেছনে উপদেষ্টার সাবেক সরকারি দায়িত্বের ভূমিকাও সামনে আসছে। এরই মধ্যে দায়িত্ব ছাড়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। গত ৩ মার্চ দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়ে তার অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে ডশ না সে ব্যাপারে বিএফআইইউ তদন্ত করছে।
অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বেও শেষ সময়ে এসে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের বিড়ম্বনায় ফেলতে ক্ষতিপূরণমূলক জরিমানা (লিকুইডেটেড ড্যামেজ) বা এলডির পরিমাণ বাড়িয়ে দেন ফাওজুল কবির। একই সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রেখে যান। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির বকেয়া কম দেখানোর উদ্দেশ্যে এ জরিমানা আরোপ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। এর মাধ্যমে পিডিবির দীর্ঘদিনের বিল পরিশোধের ব্যর্থতার দায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকদের ওপর চাপানো হয়।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, ফাওজুল কবির তার দায়িত্বের শেষ সময়ে এসে আমাদের ওপর এলডি আরোপ করেন। এর মাধ্যমে তিনি নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করেছেন। যদি এলডি আরোপ করা জাস্টিফাই হতো তাহলে দেড় বছর আগেই তিনি করতে পারতেন। আমরা শুনতে পেরেছি জামায়াতে ইসলামী এসে সরকার গঠন করবে ফাওজুল কবিরের এমন প্রত্যাশা ছিল। সে জায়গায় নতুন সরকারের কাছে নিজের ইমেজ বৃদ্ধির জন্য তিনি এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে যত কথা ফাওজুল কবির খান বলেছিলেন, করেছেন ঠিক তার উল্টো কাজ। এ খাতে তিনি স্থবিরতা তৈরি করেছেন। তার কোনো প্রকল্পই পরিকল্পিত ও গবেষণানির্ভর ছিল না। এ সময় পুরো বিদ্যুৎ খাতকে তিনি পিছিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে নতুন সরকারের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।